BRSKF (AD)
1 month ago
Education

পর্ব ২: রঙ করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, দেয়ালের স্বাস্থ্য ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার

নিচে নিবন্ধটির ২য় পর্ব (প্রায় ১,২০০+ শব্দ) দেওয়া হলো। এটিতে পেইন্টিংয়ের সঠিক ধাপ, সারফেস প্রিপারেশন, আধুনিক স্প্রে ও স্যান্ডার প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আর্দ্রতা বা নোনা ধরা দেয়াল মেরামতের প্রফেশনাল পদ্ধতি বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
পর্ব ২: রঙ করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, দেয়ালের স্বাস্থ্য ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার
বাসা-বাড়ির রঙ কেবল ঘরের সৌন্দর্য বাড়ায় না, এটি দেয়ালকে প্লাস্টার ক্ষয়ে যাওয়া, আর্দ্রতা (Dampness) এবং ছত্রাক (Fungus) থেকে সুরক্ষাও দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, নতুন রঙ করার মাত্র ৬ মাস বা ১ বছরের মধ্যে দেয়ালের রঙ ফোসকা পড়ে (Blistering) খুলে আসছে বা নোনা (Efflorescence) ধরে ঝরে পড়ছে। এর প্রধান কারণ হলো রঙের কাজে ভুল পদ্ধতি এবং নিম্নমানের সারফেস প্রিপারেশন।
এই পর্বে আমরা দেয়াল রঙ করার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রফেশনাল ধাপ, আর্দ্রতা ও নোনার স্থায়ী সমাধান এবং আধুনিক পেইন্টিং টুলের ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
২. ১. দেয়াল প্রস্তুতকরণ ও রঙ করার প্রফেশনাল ধাপসমূহ
একটি দেয়ালে রঙ কত বছর স্থায়ী হবে, তার ৮০% নির্ভর করে সারফেস প্রিপারেশনের (Surface Preparation) ওপর এবং মাত্র ২০% নির্ভর করে রঙের ব্র্যান্ডের ওপর। প্রফেশনাল পেইন্টিং কন্টাক্টররা কাজের সময় নিচের ধাপগুলো ধাপে ধাপে অনুসরণ করেন:
┌────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│ দেয়াল রঙ করার সঠিক ধাপসমূহ │
├────────────────────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ১. পুরনো রঙ/ওয়াল স্ক্র্যাপিং ──> দেয়াল সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও শুকনো করা। │
│ │
│ ২. প্রাইমার কোট (Primer) ──> দেয়াল ও রঙের মাঝে বাইন্ডিং তৈরি করা। │
│ │
│ ৩. পুটি প্রয়োগ (Wall Putty) ──> ২ কোট পুটি দিয়ে দেয়াল মসৃণ করা। │
│ │
│ ৪. স্যান্ডিং (Sanding) ──> সিরিজ কাগজ বা মেশিনে ঘষে লেভেল করা। │
│ │
│ ৫. ফাইনাল টপকোট (Topcoat) ──> ২ থেকে ৩ কোট কাঙ্ক্ষিত রঙের প্রলেপ। │
└────────────────────────────────────────────────────────────────────────┘

১ম ধাপ: স্ক্র্যাপিং ও সারফেস ক্লিনিং (Scraping & Cleaning)
* নতুন দেয়াল: প্লাস্টার করার পর কমপক্ষে ২১ থেকে ২৮ দিন সময় দিতে হবে যেন দেয়ালের প্লাস্টার পুরোপুরি শুকিয়ে যায় (Curing Time)। এরপর স্ক্যাপার বা স্ক্রাব বার দিয়ে দেয়ালের বাড়তি বালি ও সিমেন্টের গুঁড়ো ঘষে ফেলে দিতে হবে।
* পুরনো দেয়াল: পুরনো যে রঙ ঢিলে হয়ে গেছে বা ফোসকা পড়েছে, তা পাতলা পাত্টি বা স্ক্র্যাপার দিয়ে সম্পূর্ণ কুচে তুলে ফেলতে হবে। দেয়ালে কোনো শ্যাওলা বা ছত্রাক থাকলে তা ব্লিচিং পাউডার মিশ্রিত পানি দিয়ে ধুয়ে পুরোপুরি শুকাতে হবে।
২য় ধাপ: ফার্স্ট কোট ওয়াটার-বেসড প্রাইমার (Sealer/Primer Application)
পুটি বা রঙ লাগানোর আগে দেয়ালে ১ কোট ভালো মানের সিলাকিং বা প্লাস্টার প্রাইমার ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।
* এটি দেয়ালের সিমেন্টের ক্ষারীয় ভাব (Alkalinity) প্রশমিত করে।
* দেয়ালে পুটির শক্ত বাঁধন (Adhesion) নিশ্চিত করে এবং পরবর্তীতে দেয়ালের ভেতরের আর্দ্রতা বাইরে আসতে বাধা দেয়।
৩য় ধাপ: অ্যাক্রিলিক ওয়াল পুটি প্রয়োগ (Wall Putty Application)
দেয়ালের অসমান ভাব, ছোট ছোট গর্ত ও চিড় দূর করে কাচের মতো মসৃণ করতে ওয়াল পুটি দেওয়া হয়।
* সাধারণত ২ কোট পুটি দেওয়া নিয়ম। ১ম কোট দেওয়ার পর অন্তত ৪-৬ ঘণ্টা শুকাতে দিতে হয়।
* ১ম কোট লম্বালম্বি (Vertical) দিলে ২য় কোট পাশাপাশি (Horizontal) দিতে হয়, যাতে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে।
* বাথরুম বা রান্নাঘরের দেয়ালের জন্য অথবা আর্দ্রতা বেশি এমন জায়গার জন্য ওয়াটারপ্রুফ পুটি ব্যবহার করা উত্তম।
৪র্থ ধাপ: স্যান্ডিং ও স্মুথিং (Sanding)
পুটি পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে ১৫০ থেকে ২২০ গ্রিটের স্যান্ডপেপার (Series Paper) দিয়ে পুরো দেয়াল ঘষে সমান করতে হবে। এরপর একটি শুকনো সুতি কাপড় বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে দেয়ালে লেগে থাকা মেহি পুটির ধুলো সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে নিতে হবে। ধুলো দেয়ালে থেকে গেলে টপকোট রঙ খসে পড়ে যাবে।
৫ই ধাপ: টপকোট বা ফাইনাল পেইন্টিং (Topcoat Painting)
* ১ম কোট: টপকোট ইমালশন বা প্লাস্টিক পেইন্টের সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণে পানি (সাধারণত রঙের গ্যালনের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০%-৪০%) মিশিয়ে ১ম কোট দিতে হয়।
* ২য় ও ৩য় কোট: ১ম কোট দেওয়ার অন্তত ৪ ঘণ্টা পর ২য় কোট দিতে হয়। গাঢ় কালার বা প্রিমিয়াম ওয়াশেবল ফিনিশিংয়ের জন্য অনেক সময় ৩য় কোটের প্রয়োজন হয়।
২. ২. দেয়ালের ড্যাম্প (Dampness) ও নোনা (Efflorescence) সমস্যার স্থায়ী সমাধান
বাংলাদেশে প্রায় ৭০% বাসায় ড্যাম্প বা দেয়াল ভেজা থাকার সমস্যা দেখা যায়। এই সমস্যার ওপর সরাসরি প্রিমিয়াম রঙ দিলেও কয়েক মাসের মধ্যে রঙ নষ্ট হয়ে যাবে।
┌───────────────────────────┐
│ ড্যাম্প ও নোনার স্থায়ী চিকিৎসা │
└─────────────┬─────────────┘
│
┌────────────────────┴────────────────────┐
▼ ▼
┌─────────────────────────────┐ ┌─────────────────────────────┐
│ বাইরের দেয়াল বা উৎস বন্ধ │ │ কেমিকেল ওয়াটারপ্রুফিং │
├─────────────────────────────┤ ├─────────────────────────────┤
│ • পাইপের লিক মেরামত করা │ │ • ড্যাম্প-প্রুফ প্রাইমার │
│ • এক্সটেরিয়র ওয়াটারপ্রুফ রঙ │ │ • সিলিকন বা এপক্সি কোটিং │
└─────────────────────────────┘ └─────────────────────────────┘

ড্যাম্প ও নোনা দূর করার বৈজ্ঞানিক টেকনিক:
১. উৎস্য শনাক্তকরণ: আগে দেখতে হবে পানি কোথা থেকে আসছে—বাথরুমের পাইপ লিক, ছাদের ওয়াটারপ্রুফিং নষ্ট হওয়া, নাকি পাশের দেয়াল থেকে? উৎস বন্ধ না করে ভেতরের দেয়ালে রঙ করলে কাজ হবে না।
২. প্লাস্টার তুলে ফেলা (চরম নোনার ক্ষেত্রে): দেয়ালে তীব্র নোনা থাকলে আক্রান্ত অংশের প্লাস্টার ইট পর্যন্ত চেঁচে তুলে ফেলতে হবে।
৩. এন্টি-ইফ্লোরেসেন্স ও ওয়াটারপ্রুফ কেমিক্যাল: খালি ইটের ওপর 'এন্টি-ইফ্লোরেসেন্স কেমিক্যাল' স্প্রে করতে হবে। এরপর ওয়াটারপ্রুফ কেমিক্যাল (যেমন: SBR Latex বা বিশেষ ড্যাম্প-প্রুফ কম্পাউন্ড) সিমেন্টের সাথে মিশিয়ে নতুন করে প্লাস্টার করতে হবে।
৪. ড্যাম্প সিক প্রাইমার (Damp-Block Primer): নতুন প্লাস্টার শুকানোর পর সাধারণ প্রাইমারের বদলে ওয়াটারপ্রুফ ড্যাম্প-ব্লক প্রাইমার প্রয়োগ করতে হবে।
২. ৩. প্রথাগত বনাম আধুনিক পেইন্টিং প্রযুক্তি
বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে রোলার ও ব্রাশ দিয়ে রঙ করা হলেও আধুনিক বড় বড় প্রজেক্টে প্রযুক্তির ব্যবহার কাজের সময় ও খরচ দুটোই কমিয়ে দিচ্ছে।
| বিষয় | প্রথাগত পদ্ধতি (Manual) | আধুনিক প্রযুক্তি (Automated) |
|---|---|---|
| সরঞ্জাম | সাধারণ ব্রাশ, হ্যান্ড রোলার ও হাতে ঘষা কাগজ | এয়ারলেস স্প্রে গান (Airless Spray) ও ড্রাইভেন ওয়াক স্যান্ডার |
| কাজের গতি | একজন মিস্ত্রি দিনে ২০০ - ৩০০ স্কয়ার ফিট করতে পারেন | স্প্রে মেশিনে দিনে ১,৫০০ - ২,০০০ স্কয়ার ফিট করা সম্ভব |
| ফিনিশিং | ব্রাশের দাগ বা রোলারের হালকা টেক্সচার টেক্সট থেকে যায় | সম্পূর্ণ মসৃণ, সমান ও ফ্যাক্টরি-ফিনিশ লুক আসে |
| ধুলোবালি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি | স্যান্ডিংয়ের সময় বাতাস ধুলোয় ভরে যায় (ফুসফুসের ক্ষতি) | স্যান্ডারের সাথে ভ্যাকুয়াম থাকায় ৯৫% ধুলো মেশিনের ব্যাগে জমা হয় |
| উপাদানের অপচয় | ট্রের রঙ পড়ে অপচয় ও অপব্যবহার বেশি হয় | ড্রপ কম হয় এবং রঙের সঠিক কভারেজ নিশ্চিত হয় |
২. ৪. কাঠের লাকার পলিশ ও মেটাল পেইন্টিংয়ের আধুনিক কৌশল
দেয়ালের পাশাপাশি ঘরের মেহগনি, সেগুন বা বার্মাটিক কাঠের দরজা ও আসবাবপত্রের জন্য সাধারণ বার্নিশের বদলে লাকার পলিশ (Lacquer Polish) এবং লোহার গ্রিলের জন্য এপক্সি বা এনামেল পেইন্ট জনপ্রিয়।
* লাকার পলিশ (Lacquer Finish): এটি বিশেষ স্প্রে গানের মাধ্যমে দেওয়া হয়।
* প্রথমে কাঠের উপরিভাগ স্যান্ডিং স্প্রে বুথ দিয়ে নিখুঁতভাবে মসৃণ করা হয়।
* কাঠ প্রফেশনাল উড ফিলার (Wood Filler) দিয়ে কাঠকে সিল করা হয়।
* এরপর 'সিলার কোট' এবং ফাইনাল 'পলিউরেথেন (PU) লাকার' স্প্রে করা হয়। এটি কাঠকে ঘুণপোকা ও পানি থেকে রক্ষা করে এবং প্রিমিয়াম গ্লোসি বা ম্যাট ফিনিশ দেয়।
* মেটাল পেইন্টিং (Enamel & Anti-Rust Primer): লোহার গ্রিল বা গেটে সরাসরি এনামেল রঙ দেওয়া বড় ভুল। প্রথমে লাল বা ধূসর রঙের রেড অক্সাইড প্রাইমার (Red Oxide Primer) দিয়ে মরচে ধরা বন্ধ করতে হবে। প্রাইমার শুকানোর পর ২ কোট সিন্থেটিক এনামেল রঙ প্রয়োগ করতে হবে।

Source: Brskf.com
0
Comments (0)
Log in to post a comment.

No comments yet. Be the first to comment!